২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, শনিবার

মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ

আপডেট: ফেব্রুয়ারি ২০, ২০২৬

অনলাইন নিউজ: আজ শনিবার, ৮ ফাল্গুন, অমর একুশে ফেব্রুয়ারি। মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ। ১৯৫২ সালের এই দিনে মায়ের ভাষাকে রক্ষা করার জন্য শহীদ হয়েছিলেন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ আরো অনেকে। মাতৃভাষার জন্য বুকের রক্ত দেওয়ার এমন উদাহরণ বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

গৌরবময় এই দিনটিকে আজ বাঙালি জাতিসহ বিশ্বের সব দেশের মানুষ স্মরণ করবে।প্রয়াত ভাষাসৈনিক ও লেখক আহমদ রফিক তাঁর ‘ভাষা আন্দোলন’ বইয়ে একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যার বর্ণনায় লিখেছেন, ‘একুশে ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যারাতের সময়টা শাসকদের জন্য বোধ করি কালবেলার মতো হয়ে ওঠে। যেমন পরিবেশে, তেমনি ঘটনার তাত্পর্যে। তখন মেডিকেল হোস্টেল প্রাঙ্গণে ছুটে আসা মানুষের পায়ে পায়ে ওঠা ধুলো আর কাঁদানে গ্যাসের ধোঁয়াটে গন্ধের অবশিষ্ট মিলে এক অভাবিত পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল।
ছাত্র-জনতার শোক ও কান্না শাসকশ্রেণির বিরুদ্ধে এক ধরনের ঘৃণা ও শক্তির জন্ম দেয়, যা আন্দোলনের জন্য হয়ে ওঠে বিস্ফোরক পুঁজি।’১৪৪ ধারা ভঙ্গের মাধ্যমে যে একুশের সকাল শুরু হয়েছিল, গুলিবর্ষণ, রক্তপাত, মৃত্যুর ঘটনায় একুশের সন্ধ্যা শাসকদের জন্য হয়ে ওঠে কালবেলার মতো। আজ শুধু বাঙালি, বাংলাদেশে বা বাংলা ভাষা নয়, বিশ্বের সব দেশ, জাতি ও ভাষাভাষীর জন্য একুশ এক অমর ও অক্ষয় চেতনার নাম।দিবসটি উপলক্ষে পৃথক বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

বাংলাদেশের স্বাধিকার, মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে অমর একুশের চেতনা অফুরন্ত প্রেরণা ও অসীম সাহস জুগিয়েছে উল্লেখ করে বাণীতে রাষ্ট্রপতি বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন ভাষাভাষী মানুষের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষায় অমর একুশের চেতনা আজ অনুপ্রেরণার অবিরাম উত্স। ভাষা একটি জাতির অস্তিত্ব, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রধান ধারক ও বাহক।’মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার ভাষা আন্দোলন শুধু ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠাই করেনি, বরং বাঙালির স্বাধিকার, গণতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক চেতনার ভিত্তিকে মজবুত ও সুদৃঢ় করেছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, জনগণের অধিকার ও সমতা প্রতিষ্ঠাই ছিল একুশের মূল চেতনা। এ চেতনাকে ধারণ করে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম পার হয়ে দেশে আজ গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে। গণতন্ত্রের এই অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
আমরা ভাষা শহীদ এবং একাত্তর সালে স্বাধীনতা অর্জন ও ২০২৪-এর স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এযাবত্কালে দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সব শহীদের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ ও মানবিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়তে চাই।’১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটি আলাদা রাষ্ট্র হয়। পাকিস্তানের জন্মের শুরুতেই পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব বাংলার মানুষের ওপর একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দুকে চাপিয়ে দিতে উদ্যত হয়। পাকিস্তানের জন্মের শুরুতেই ভাষার ওপর আঘাত, স্বপ্নভঙ্গের বেদনা। সেই আশাভঙ্গের বেদনা থেকেই পরবর্তী সময়ে ধীরে ধীরে জন্ম নেয় বাঙালির ভাষাভিত্তিক চেতনা, সচেতনভাবে আত্মপরিচয় ও শিকড়ের অন্বেষণের যাত্রা। উন্মেষ ঘটে জাতীয়তাবাদের।বাঙালির সঙ্গে ভাষা নিয়ে চলা এ লড়াইয়ের চূড়ান্ত রূপ নেয় ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে। বায়ান্নর ফেব্রুয়ারিজুড়ে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে আন্দোলন ও সংগ্রামমুখর ছিল পূর্ব বাংলার মানুষ। আন্দোলন দমনে পুলিশ ঢাকা শহরে মিছিল-সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেই ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি শিক্ষার্থী ও রাজনৈতিক কর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন। মিছিলটি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের কাছাকাছি এলে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণ শুরু হয়।

রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য, মায়ের ভাষার জন্য হওয়া ভাষা আন্দোলনে শহীদ হন সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ নাম না জানা আরো অনেকে। তাঁদের রক্তের বিনিময়েই পরে বাংলা রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা পায়।

১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনই পথ দেখায় এ অঞ্চলের মানুষকে। দুই দশকে একের পর এক আন্দোলন রূপ নেয় স্বাধিকার ও স্বাধীনতার চেতনায়। এরই পথ ধরে ৯ মাসের মহান মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নেয় স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।

শুরুতে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবস হিসেবে পরিচিত হলেও পরে দিনটি ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবেও খ্যাত হয়। ভাষার জন্য এই আত্মত্যাগ আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় ১৯৯৯ সালের ১৭ নভেম্বর। এদিন জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি বিষয়ক সংস্থা ইউনেসকো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। এর পর থেকে দিনটি বিশ্বের সব দেশে পালিত হয়ে আসছে।

মাতৃভাষা ও একুশের শহীদদের স্মরণে আজ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় অবনত হবে জাতি। একুশের প্রভাতফেরিতে বেজে উঠবে সেই অশ্রুসিক্ত ও বেদনামথিত চেনা সুর—‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি/ আমি কি ভুলিতে পারি…’। ফুলে ফুলে ছেয়ে যাবে শহীদ মিনার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের মূল অনুষ্ঠানের সঙ্গে সারা দেশে নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে পালন করা হবে একুশে ফেব্রুয়ারি।

রাষ্ট্রীয়ভাবে দিবসটি উদযাপনে নানা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলও নিজ নিজ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। দল-মত-নির্বিশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ আজ নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবে।

বাসস জানিয়েছে, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাত ১২টা ১ মিনিটে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হয়।

একুশের ভোরে কালো ব্যাজ ধারণ করে প্রভাতফেরিসহ আজিমপুর কবরস্থানে শহীদদের কবরে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে ও শ্রদ্ধা জানাবে সর্বস্তরের জনতা।

দিবসটি উপলক্ষে আজ সাধারণ ছুটি। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থাকবে। ভাষাশহীদদের রুহের মাগফিরাত কামনায় আজিমপুর কবরস্থানে ফাতেহা পাঠ ও কোরআনখানির আয়োজন করা হয়েছে।
দেশের সব মসজিদ, মন্দির ও অন্যান্য উপাসনালয়ে বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হবে আজ। দিবসটির তাত্পর্য তুলে ধরে বাংলাদেশ বেতার, বাংলাদেশ টেলিভিশনসহ সব স্যাটেলাইট চ্যানেলে অনুষ্ঠান প্রচার করা হবে। সংবাদপত্রে থাকছে বিশেষ আয়োজন।

অমর একুশে বক্তৃতার আয়োজন করেছে বাংলা একাডেমি। সকাল ১১টায় একাডেমির নজরুল মঞ্চে বক্তব্য দেবেন অর্থনীতিবিদ ড. মাহবুব উল্লাহ্। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। সভাপ্রধান হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। এর আগে সকাল ৮টা থেকে ১০টা পর্যন্ত নজরুল মঞ্চে কবি আবদুল হাই শিকদারের সভাপতিত্বে চলবে স্বরচিত কবিতা পাঠের আসর।

ঐতিহ্যবাহী সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানটেও থাকছে বিশেষ আয়োজন। সকাল সাড়ে ১০টায় ছায়ানট মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে একক ও সম্মেলক গান, পাঠ-আবৃত্তি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর বাংলা এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠী ও বিদেশি ভাষার কবিতা পাঠ ও আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

10 বার নিউজটি শেয়ার হয়েছে
  • ফেইসবুক শেয়ার করুন