অনলাইন নিউজঃ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির পর চার মাসেরও বেশি সময় আগে যুদ্ধের শুরুতেই নিহত ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির শেষ বিদায়ের ছয় দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা গতকাল শনিবার থেকে তেহরানে শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধের প্রথম দিনই মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলায় ৮৬ বছর বয়সী এ নেতা তার পরিবারের চার সদস্যসহ নিহত হন। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গতকাল শুরু হওয়া খামেনির শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ইরানের রাজধানী তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লা কমপ্লেক্সে মানুষের ঢল নেমেছে। কালো পোশাক পরিহিত এবং শিয়া ইসলামের ঐতিহ্য অনুযায়ী প্রতিশোধের প্রতীক রক্ত-লাল পতাকা হাতে সমবেত জনতা পুরো মোসাল্লা প্রাঙ্গণকে ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ, প্রতিশোধ’ স্লোগানে প্রকম্পিত করে তোলেন।

ইরানের সংবাদমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরানের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা এবং বিপ্লবী আদর্শের প্রতি জনসমর্থন ও পশ্চিমাদের প্রতি এক অবাধ্যতার বার্তা প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে এ বিশাল আয়োজন করা হয়েছে। খামেনির কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় পৌঁছানোর আগেই সেখানে অগণিত মানুষ জড়ো হন। প্রায় ৩৭ বছর ইরান শাসন করা এ নেতার প্রয়াণে শোকগ্রস্ত মানুষ বুক চাপড়ে, কান্নায় ভেঙে পড়ে তাদের আবেগ প্রকাশ করেন। এ সময় খামেনির ছবির পাশাপাশি তার ছেলে ও বর্তমান সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির ছবিসংবলিত পোস্টার প্রদর্শন করেন শোকগ্রস্ত ইরানিরা। ইরানি কর্তৃপক্ষ খামেনির শেষ বিদায় ঘিরে রাষ্ট্রীয় এ আনুষ্ঠানিকতাকে ‘শতকের সেরা জানাজা’ হিসেবে অভিহিত করেছে। এ আনুষ্ঠানিকতা ঘিরে ইরানের রাজধানীতে তেহরানে ১ কোটি ২০ লাখ থেকে ২ কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে বলে দেশটির কর্মকর্তারা ধারণা করছেন। তবে খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতায় তার ছেলে এবং দেশটির নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি উপস্থিত থাকবেন না বলে জানা গেছে।

গতকাল শনিবার সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করার আগে শুক্রবার মোসাল্লা কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরে ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশি গণ্যমান্য ব্যক্তিরা প্রয়াত সর্বোচ্চ নেতার প্রতি শেষ শ্রদ্ধা জানান। প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার প্রচণ্ড গরমের মধ্যেও হাজার হাজার নারী ও পুরুষ লিঙ্গভিত্তিক কঠোর বিভাজন মেনে বিশাল এ ধর্মীয় কমপ্লেক্সে সারিবদ্ধভাবে ভিড় করেন। জনতাকে স্বস্তি দিতে সেখানে জলকণা ছিটানোর ব্যবস্থা করা হয়। খামেনির কফিনের ওপর একটি কালো পাগড়ি ও ভাঁজ করা চেক নকশার স্কার্ফ রাখা ছিল, যা ইরানে বিপ্লবী আদর্শ ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি সংহতির প্রতীক। অপেক্ষমাণ জনতার উঁচু করে তোলা হাতের ওপর দিয়ে কফিনগুলো বহন করে এনে জাতীয় ও কালো শোক পতাকায় ঘেরা একটি সাদা ধাপযুক্ত উঁচু মঞ্চে স্থাপন করা হয়।

প্রয়াত নেতার প্রতি গভীর ভালোবাসা প্রকাশ করে ৩৮ বছর বয়সী ধর্মীয় শিক্ষক মোহাম্মদ মিরসালেহি বলেন, ‘নেতা আমাদের সবার বাবার মতো ছিলেন। তার চলে যাওয়ায় আমরা সবাই এতিম হয়ে গেছি।’ হামিদরেজা শাবানি নামে ১৮ বছরের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের অবশ্যই জেগে উঠতে হবে এবং আমাদের নেতার রক্তের প্রতিশোধ নিতে হবে।’

‘প্রতিশোধ প্রতিশোধ’ স্লোগানে প্রকম্পিত মোসাল্লা: মোসাল্লার বিশাল চত্বরজুড়ে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সেদা ওয়া সিসার মাইকে যখন শোকগাথা বাজছিল, তখন সমবেত জনতাকে ‘আসুন আমরা বিলাপ করি’ বলে উৎসাহিত করা হচ্ছিল। শিয়া ঐতিহ্যের ত্যাগ ও শাহাদাতের প্রতীক ইমাম হোসাইনের নাম স্মরণ করিয়ে দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে জনতা বুক চাপড়ে চিৎকার করে কাঁদতে থাকে। সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী খামেনির মৃত্যুর তীব্র প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছে এবং মোসাল্লাজুড়ে বারবার ‘আমেরিকা ধ্বংস হোক’ এবং ‘প্রতিশোধ’ স্লোগান প্রতিধ্বনিত হতে থাকে। ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও শান্তি আলোচনার শীর্ষ মধ্যস্থতাকারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ অশ্রুসজল চোখে বলেন, ‘জাতির প্রতিশোধের আহ্বান যেন পুরো বিশ্বের কানে পৌঁছায়।’

ইসরায়েলি হামলায় খামেনির সঙ্গে নিহত তার পরিবারের অন্য চার সদস্যের কফিনও পাশাপাশি রাখা হয়েছে। এর মধ্যে খামেনির কন্যা, জামাতা, পুত্রবধূ জোহরা হাদ্দাদ আদেল এবং মাত্র ১৪ মাস বয়সী নাতনি জোহরা মোহাম্মদী গোলপায়গানির ছোট কফিনটি বিশেষভাবে প্রদর্শিত হয়।

চার মাসেরও বেশি সময় যুদ্ধাবস্থার কারণে খামেনির জানাজা ও দাফন স্থগিত থাকলেও গত জুন মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি প্রাথমিক যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরের পর এ আয়োজন সম্ভব হলো। নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, কফিনগুলো তিন দিন তেহরানের মোসাল্লায় থাকবে। এরপর মঙ্গলবার শিয়া ধর্মীয় কেন্দ্র কোমের জামকারান মসজিদে জানাজা হবে। বুধবার কফিন নিয়ে যাওয়া হবে ইরাকের নাজাফ ও কারবালায়। পরিশেষে, আগামী বৃহস্পতিবার খামেনির জন্মশহর মাশহাদের পবিত্র ইমাম রেজা মাজার প্রাঙ্গণে তাকে তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দাফন করা হবে। এ উপলক্ষে বুধবার ইরাকের রাজধানী বাগদাদেও সব অফিস-আদালত বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বৈশ্বিক নেতাদের উপস্থিতি ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা: খামেনির এ বিদায় অনুষ্ঠানে যোগ দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা তেহরানে পৌঁছেছেন। গতকাল শ্রদ্ধা নিবেদনে উপস্থিত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, রাশিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট দিমিত্রি মেদভেদেভ, আফগানিস্তানের তালেবান সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আমির খান মুত্তাকি, চীনের ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের উপপ্রধান হে উই ও ইরাকের প্রেসিডেন্ট নিজার আমেদি। এ ছাড়া সৌদি আরব, কাতার, ওমান, তুরস্ক ও আর্মেনিয়ার প্রতিনিধিদল এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ নেতা হাসান নাসরাল্লাহ ও ইমাদ মুঘনিয়েহর পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন।

এ বিশাল জমায়েতকে কেন্দ্র করে তেহরানে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। প্রধান সড়কগুলোতে সামরিক যান এবং মোটরসাইকেলে বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর টহল জোরদার করা হয়েছে। শনি থেকে সোমবার পর্যন্ত তেহরানের সব অফিস বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং সোমবার তেহরানের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ খোমেনির দাফনের পর এটিই ইরানের সবচেয়ে বড় জনসমাবেশ হতে যাচ্ছে, তাই পদদলন এড়াতে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বিশেষ সচেতনতামূলক নির্দেশনা সম্প্রচার করা হচ্ছে। অন্যদিকে, খামেনির শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা চলাকালীন কোনো ধরনের হামলা না করার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে কঠোরভাবে সতর্ক করেছে ইরান।

ইরান চুক্তি করতে মরিয়া, দাবি ট্রাম্পের: এদিকে ৪ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা বার্ষিকী উদযাপনের প্রাক্কালে মাউন্ট রাশমোরে এক অনুষ্ঠানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের এ শোক পালন নিয়ে মন্তব্য করেছেন। ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি চুক্তি করতে অত্যন্ত আগ্রহী এবং তারা বিষয়টি সমাধান করতে মরিয়া। ট্রাম্প আরও বলেন, ‘আমরা তাদের দাফন সম্পন্ন করার জন্য এক সপ্তাহ সময় দিয়েছি, কারণ আমরা ভালো।’