ডেস্ক রিপোর্ট: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনে প্রচার-প্রচারণা শুরু হয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন বিভিন্ন প্যানেল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা। এ ছাড়া নির্বাচনে ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে ক্যাম্পাসের সাতটি প্রবেশমুখে সেনাবাহিনী অবস্থান করবে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে দৈনিক সমকাল। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রয়োজন অনুযায়ী সেনাবাহিনী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করবে এবং ভোট শেষে ফলাফল প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত ভোটকেন্দ্র সেনাসদস্যরা ঘিরে রাখবেন। ভোট গণনার সময় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কারও প্রবেশের সুযোগ থাকবে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বরাতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা জানান, রিটার্নিং কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ বাহিনী দায়িত্ব পালন করবে। ইতোমধ্যে টহল টিমসহ সংশ্লিষ্ট শাখাগুলো সক্রিয় রয়েছে। ভোট গ্রহণের দিন আটটি ভোটকেন্দ্রে তিন স্তরের নিরাপত্তা থাকবে। প্রথম স্তরে থাকবেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএনসিসি সদস্য ও প্রক্টরিয়াল টিম। দ্বিতীয় স্তরে পুলিশ বাহিনী মোতায়েন থাকবে। তৃতীয় স্তরে সেনাবাহিনী ‘স্ট্রাইকিং ফোর্স’ হিসেবে ক্যাম্পাসের সাতটি প্রবেশমুখে অবস্থান করবে।

নির্বাচন কমিশন সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনের সাত দিন আগে থেকে আবাসিক হলে কোনো বহিরাগত থাকতে পারবে না। নিয়মিত টহল পরিচালনার মাধ্যমে এ ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। তবে ছাত্রীদের হলগুলোতে কখনোই বহিরাগত থাকতে পারবে না। নির্বাচনের আগের দিন ও নির্বাচনের দিন ৯ সেপ্টেম্বর মেট্রোরেলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্টেশন বন্ধ থাকবে। নির্বাচনের দিন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস পুরোপুরি সিলগালা থাকবে। বৈধ শিক্ষার্থী, অনুমোদিত সাংবাদিক ও নির্বাচন পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যেসব শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসের বাইরে থাকেন, তাদের ভোটদানের জন্য বিভিন্ন রুটে বাসের অতিরিক্ত ট্রিপের ব্যবস্থা করা হবে।

এসব বাসের নির্বিঘ্নে চলাচল নিশ্চিত করতে পুলিশের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হবে।

এদিকে গতকাল বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের মধ্য দিয়ে প্রচার কার্যক্রম সূচনা করে সাতটি বাম ছাত্র সংগঠনের প্যানেল ‘প্রতিরোধ পর্ষদ’। এই প্যানেল থেকে ভিপি প্রার্থী শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, জিএস প্রার্থী মেঘমল্লার বসু এবং এজিএস প্রার্থী মো. জাবির আহমেদ জুবেলের নেতৃত্বে প্যানেলটি শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।

দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদের সামনে থেকে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম শুরু করে ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল ‘ঐক্যবদ্ধ শিক্ষার্থী জোট’। এ সময় এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী আবু সাদিক কায়েমসহ অন্য প্রার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।

বিকেল সাড়ে ৩টায় ছাত্রদলের প্যানেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি চত্বরে মহান একাত্তরের শহীদদের স্মৃতিফলক ‘স্মৃতি চিরন্তনে’ শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রচার কার্যক্রম শুরু করে। একই সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের  জগন্নাথ হলের বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে নির্বাচনী প্রচার শুরু করেন ‘স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য’। সেখানে এই প্যানেলের ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা, জিএস প্রার্থী আল সাদী ভূঁইয়াসহ প্যানেলের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।

এ ছাড়া বিকেলে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ প্যানেল ‘বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ’ কবি জসীম উদ্‌দীন হল এবং ছাত্র অধিকার পরিষদের প্যানেল ‘ডাকসু ফর চেঞ্জ’ প্যানেল ভিসি চত্বর থেকে নির্বাচনী প্রচার শুরু করে। সকালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবর জিয়ারতের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে ইসলামী ছাত্র আন্দোলন সমর্থিত প্যানেল ‘সচেতন শিক্ষার্থী সংসদ’।
এ ছাড়া দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে থেকে প্রচারণা শুরু করেন এজিএস প্রার্থী তাহমীদ আল মুদ্দাসসির চৌধুরী, ক্রীড়া সম্পাদক প্রার্থী জহিন ফেরদৌস জামি ও সদস্য প্রার্থী সরদার নাদিম মাহমুদ শুভ। এসব প্যানেলের বাইরেও স্বতন্ত্রভাবে অনেকে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেন।

সরেজমিন দেখা যায়, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রার্থীরা হাসিমুখে কুশল বিনিময় করেন। ভোটারদের লিফলেট ও হ্যান্ডবিল বিলি করেন মাঝে ছাত্রদলের প্রার্থীরা। ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে নিজেদের ব্যানার-ফেস্টুন ঝুলিয়েছে শিবির। তবে অন্য প্যানেল বা প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুন তেমন একটা দেখা যায়নি।

প্রচার কার্যক্রমের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন শিবিরের ভিপি প্রার্থী সাদিক কায়েম। তিনি বলেন, আমরা কেমন বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ করতে চাই, সে রূপরেখা শিক্ষার্থীদের দেওয়া উচিত। কিন্তু আমরা যদি প্রোপাগান্ডা করি, ট্যাগিং এবং ফ্রেমিংয়ের রাজনীতি করি, তাহলে শিক্ষার্থীরা তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান থেকে একাডেমিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে চাই আমরা। এখানে রাজনীতির নামে অপরাজনীতির কারণে শিক্ষার্থীদের রাজনীতির প্রতি অনীহা তৈরি হয়।

প্রচার কার্যক্রম শুরু করে আরেক ভিপি প্রার্থী উমামা ফাতেমা বলেন, ডাকসু যেন নিয়মিত এবং অনাড়ম্বরভাবে আয়োজিত হতে পারে, সেটি প্রশাসনকে দেখতে হবে। প্রচার-প্রচারণা এমনভাবে করব, যেন শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কার্যক্রমে কোনো ব্যাঘাত না ঘটে। অনেক প্রার্থী ১০-১৫ দিন আগ থেকেই অলিখিতভাবে প্রচারণা করেছে। আমরা বারবার বললেও প্রশাসন ব্যবস্থা নেয়নি।

প্রথম দিনেই নানা অভিযোগ
প্রচারণার প্রথম দিনই শিবিরের দুটি ব্যানার ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। মঙ্গলবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে দুই ধাপে এ ঘটনা ঘটে। সহকারী প্রক্টরের সংগৃহীত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, দুজন শিক্ষার্থী ব্যানার ভাঙচুর করছেন। তাদের একজন চারুকলা অনুষদের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তোহান মজুমদার। তবে তিনি ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে শিবিরের জিএস প্রার্থী এস এম ফরহাদ বলেন, প্রচারণার প্রথম দিনই আমাদের ফেস্টুন ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। নির্বাচন কমিশনের উচিত দ্রুত তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তির ব্যবস্থা করা।

সহকারী প্রক্টর ইসরাফিল প্রাং বলেন, কারা এবং কী উদ্দেশ্যে এ ঘটনা ঘটিয়েছে তা তদন্ত সাপেক্ষে জানা যাবে।
এদিকে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার-সংক্রান্ত একটি অভিযোগ এনেছেন স্যার এ এফ রহমান হলের স্বতন্ত্র জিএস প্রার্থী আশিকুল হক রিফাত। গতকাল বিকেলে তিনি চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে একটি লিখিত অভিযোগ জমা দেন। নির্বাচন কমিশনার কাজী মারুফুল হক বলেন, লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নির্বাচন কমিশনের বৈঠক
নির্বাচন উপলক্ষে ডাকসু ও হল পর্যায়ের ভিপি, জিএস ও এজিএস প্রার্থীদের সঙ্গে সিনেট ভবনে চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তাদের শুভেচ্ছা ও মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে সভাপতিত্ব করেন চিফ রিটার্নিং কর্মকর্তা ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন। এ সময় রিটার্নিং কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এবং সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং কর্মকর্তারা দিকনির্দেশনা দেন।

বৈঠক শেষে ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী আবিদুল ইসলাম খান বলেন, ডাকসু নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি শুনিয়েছে; কিন্তু প্রার্থীদের মতামত গ্রহণ করেনি। প্রায় ৪০ হাজার ভোটারের জন্য মাত্র আটটি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে। ডাকসু ও হল সংসদ মিলিয়ে প্রতিজনকে ৪১টি ভোট দিতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ। এক ঘণ্টায় একটি বুথে সর্বোচ্চ ৪০-৫০ ভোট দেওয়া সম্ভব। যদি ২০টি বুথ থাকে, তবুও দিনে এক হাজার ১০০ থেকে এক হাজার ২০০ ভোটের বেশি কাস্ট সম্ভব নয়।

চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ
ডাকসু নির্বাচনে গতকাল সিনেট ভবনে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। এই তালিকায় স্থান পেয়েছেন ৪৭১ প্রার্থী। এর মধ্যে ভিপি পদে পাঁচ প্রার্থী বাদ পড়েছেন। পাশাপাশি এই পদে নতুন করে দুই প্রার্থী যুক্ত হয়েছেন। এ নিয়ে এই পদে প্রার্থী হিসেবে জায়গা পেয়েছেন ৪৫ জন।

এর আগে গত ১২ থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত ৫০৯ প্রার্থী মনোনয়পত্র সংগ্রহ করেন। তাদের ৪৬২ জন খসড়া প্রার্থী তালিকায় স্থান পান। এ বছর কেন্দ্রীয় সংসদে ২৮ পদে শিক্ষার্থীরা লড়ছেন। এর মধ্যে ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন ৪৫ জন, জিএস পদে ১৯, এজিএস পদে ২৫, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলন সম্পাদক পদে ১৭; কমনরুম, রিডিংরুম ও ক্যাফেটেরিয়া সম্পাদক পদে ১১, আন্তর্জাতিক সম্পাদক পদে ১৪, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ১৯, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সম্পাদক পদে ১২, গবেষণা ও প্রকাশনা সম্পাদক পদে ৯, ক্রীড়া সম্পাদক পদে ১৩, ছাত্র পরিবহন সম্পাদক পদে ১২, সমাজসেবা সম্পাদক পদে ১৭, স্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পাদক পদে ১৫, মানবাধিকার ও আইনবিষয়ক সম্পাদক পদে ১১, ক্যারিয়ার ডেভেলপমেন্ট সম্পাদক পদে ১৫ এবং সদস্য পদে ২১৭ জন।
চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খসড়া তালিকায় ভিপি প্রার্থী ছিলেন ৪৮ জন। এর মধ্যে স্থান পাওয়া পাঁচ প্রার্থী বাদ পড়েছেন। পাশাপাশি দুই প্রার্থী নতুন করে যুক্ত হয়েছেন।
এদিকে ডাকসুর চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকায় ভিপি পদে জুলিয়াস সিজার তালুকদারের প্রার্থিতাও বহাল রাখা হয়েছে। ভিপি প্রার্থীদের মধ্যে তাঁর ব্যালট নম্বর ২৬। এর আগে, গত সোমবার অভিযোগ নিষ্পত্তি ট্রাইব্যুনাল তাঁর প্রার্থিতা বাতিলের সুপারিশ করেছিল। ট্রাইব্যুনালের দাবি ছিল, তিনি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে এবং সংগঠনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। তবে জুলিয়াস সিজার এই অভিযোগকে একপক্ষীয় ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে প্রধান রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাল্টা আবেদন জমা দেন। শেষ পর্যন্ত তাঁর আবেদন গ্রহণ করে নির্বাচন কর্তৃপক্ষ।